থাইল্যান্ডের ১৯ দিনে মিথিলার জীবন পাল্টে গেল

থাইল্যান্ডের ১৯ দিনে মিথিলার জীবন পাল্টে গেল থাইল্যান্ডের ১৯ দিনে মিথিলার জীবন পাল্টে গেল

প্রতিরাতে মাত্র তিন ঘণ্টা ঘুম, ভোর পাঁচটায় শুরু হতো নতুন দিন—ফিরে এলেন সম্পূর্ণ নতুন মানুষ হয়ে

মিস ইউনিভার্সের ঝলমলে মুকুট হাতে এলো না, কিন্তু তানজিয়া জামান মিথিলা যা নিয়ে ফিরছেন তা অনেক বেশি মূল্যবান। থাইল্যান্ডে কাটানো ১৯টি দিন শুধু একটি প্রতিযোগিতা ছিল না—ছিল জীবনের এক বিরাট পরিবর্তনের যাত্রা। যে মিথিলা গিয়েছিলেন, যে মিথিলা ফিরছেন—দুজন সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ।

সোমবার ঢাকায় ফেরার ঠিক আগে, রোববার সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে দেওয়া এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে খুলে বললেন তার মনের কথা। জানালেন সংগ্রামের গল্প, সফলতার বিবরণ এবং আগামীর স্বপ্নের কথা।

টানা ১৬ ঘণ্টা ঘুম—ক্লান্তির পেছনের গল্প

প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার পর থেকে মিথিলার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। শনিবার সকাল থেকে একের পর এক চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছিল। মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ—কোথাও সাড়া নেই।

রোববার সন্ধ্যায় যখন অবশেষে ফোন ধরলেন, হাসতে হাসতে বললেন, “গত দুদিন আমি দিনে ১৬ ঘণ্টা করে শুধু ঘুমিয়েছি। সব ধরনের ফোন আর মেসেজ থেকে একদম দূরে ছিলাম।”

এই অস্বাভাবিক ঘুমের পেছনে লুকিয়ে আছে এক অবিশ্বাস্য পরিশ্রমের কাহিনি। মিথিলা জানান, “পুরো ১৯ দিন রোজ কেবল তিন ঘণ্টা করে ঘুমিয়েছি। সারাদিনের ইভেন্ট, ফটোশুট, রিহার্সাল শেষে রুমে ঢুকে মেকআপ সরিয়ে বিছানায় যাই রাত দুইটায়। তারপর সকাল পাঁচটায় আবার উঠতে হয়। তৈরি হয়ে ঠিক সাতটায় লবিতে হাজির হতে হতো। শুরু হতো নতুন দিনের ম্যারাথন। তাই প্রতিযোগিতা শেষে প্রথম কাজ ছিল ঘুম—ভরপুর ঘুম!”

এই ছিল মিস ইউনিভার্স ক্যাম্পের বাস্তবতা। প্রতিটি মুহূর্ত কাজে কাটাতে হয়েছে। বিশ্রামের সময় ছিল নামমাত্র।

ক্লোজডোর ইন্টারভিউয়ে চমক

মুকুট জিততে না পারলেও মিথিলার ঝুলিতে অর্জনের অভাব নেই। পিপলস চয়েজে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তো ছিলই, কিন্তু আসল সাফল্য এসেছে ক্লোজডোর ইন্টারভিউ রাউন্ডে।

“১২১টি দেশ থেকে আসা প্রতিযোগীদের মধ্যে আমি পঞ্চম হয়েছি সেই ইন্টারভিউয়ে,” গর্বের সঙ্গে জানান মিথিলা। তারপর আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য দিলেন, “জানেন? সেখানে চ্যাম্পিয়ন ফাতিমাও আমার পেছনে ছিল!”

হ্যাঁ, যে ফাতিমা বশ শেষ পর্যন্ত মিস ইউনিভার্স হয়েছেন, ক্লোজডোর ইন্টারভিউয়ে তিনি মিথিলার পেছনে ছিলেন। এটি প্রমাণ করে মিথিলার বুদ্ধিমত্তা, কমিউনিকেশন স্কিল এবং পার্সোনালিটির শক্তি কতটা প্রবল।

এছাড়া সেরা ৩০-তে জায়গা করে নেওয়াও ছিল বিশাল প্রাপ্তি। মিথিলা বলেন, “পিপলস চয়েজে ভোটারদের ভালোবাসা পেয়েছি—এটা সবাই দেখেছে। সেরা ৩০-এ জায়গা হয়েছে। ক্লোজডোর ইন্টারভিউয়ে পঞ্চম। এই অভিজ্ঞতাগুলো অমূল্য। পাশাপাশি আমার কোথায় আরও উন্নতি দরকার, সেটাও স্পষ্ট হয়েছে।”

নতুন মিথিলার জন্ম

মিথিলা বলছেন, মিস ইউনিভার্স তাকে নতুনভাবে গড়ে দিয়েছে। “১৯ দিনে আমি যতটা শিখেছি, বছরের পর বছরেও হয়তো শেখা যেত না,” বললেন তিনি।

কী শিখলেন? “সময় ম্যানেজমেন্ট, ডিসিপ্লিন, কমিউনিকেশন স্কিল, সেলফ প্রেজেন্টেশন—সব কিছুতেই নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির শিল্প।”

মিথিলা জানান, বিভিন্ন দেশের অনেক প্রতিযোগীর সঙ্গে তার গভীর বন্ধুত্ব হয়েছে। “সিস্টারহুড—এই শব্দটার মানে আমি আগে জানতাম, কিন্তু অনুভব করিনি। এখানে প্রতিযোগিতার মধ্যেও কীভাবে একে অপরকে সাপোর্ট করতে হয়, রিস্পেক্ট করতে হয়—সেটা শিখেছি। মিস ইউনিভার্স আমাকে রিশেপ করেছে। আমি এখন সম্পূর্ণ নতুন একজন মানুষ।”

সিনেমায় ফুল টাইম ক্যারিয়ারের সিদ্ধান্ত

থাইল্যান্ড থেকে ফেরার আগেই মিথিলা ঘোষণা দিয়ে দিলেন তার পরবর্তী গন্তব্যের। তিনি এখন পুরোপুরি সিনেমায় মনোযোগ দেবেন।

“সিনেমায় অভিনয় নিয়ে আমি সিরিয়াসলি চিন্তা করছি। ফাইনাল ডিসিশন নিয়ে ফেলেছি যে নিয়মিত অভিনয় করব,” জানালেন মিথিলা।

হায়দার খান পরিচালিত ‘রোহিঙ্গা’ ছবিতে অভিনয় করা মিথিলা এখন চান সিনেমাকে ক্যারিয়ারের মূল ফোকাস বানাতে।

তার হাতে নাকি বেশ কয়েকটি ছবির অফার এসেছে। কিন্তু যেকোনো কিছুতে রাজি নন তিনি। “এলোমেলো প্রজেক্ট করতে চাই না। একটা ভালো স্টোরি, মানসম্মত প্রোডাকশন দিয়ে আমার সিনেমা ক্যারিয়ার শুরু হোক—এটাই প্রত্যাশা,” স্পষ্ট করলেন মিথিলা।

বিতর্কময় মিস ইউনিভার্স ২০২৫

এবারের মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতা বিতর্ক এড়াতে পারেনি। শুরু থেকেই নানা ঘটনায় আলোচনায় ছিল আয়োজন।

প্রতিযোগিতা শুরুর আগে আয়োজকদের হাতে অপমানিত হন বলে অভিযোগ ওঠে মেক্সিকোর ফাতিমা বশের। এই ঘটনা নিয়ে অন্যান্য প্রতিযোগীদের মধ্যেও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল।

আরও চমকপ্রদ ঘটনা ঘটে ফাইনালের তিন দিন আগে। দুজন বিচারক হঠাৎ পদত্যাগ করেন। তাদের একজন নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে ‘অস্বচ্ছতার’ অভিযোগ তোলেন। এই ঘটনা পুরো আয়োজনে তৈরি করে অস্বস্তিকর পরিবেশ।

তবে সব বাধা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত জয়ী হন ২৫ বছরের সমাজকর্মী ফাতিমা বশ। গতবারের চ্যাম্পিয়ন ডেনমার্কের ভিক্টোরিয়া কেজার থেলভিগ তাকে মুকুট পরিয়ে দেন। আর প্রথম রানারআপ হন থাইল্যান্ডের প্রবিনার সিং।

দেশে ফিরছেন সোমবার

মিথিলা সোমবার থাইল্যান্ড থেকে দেশে ফিরছেন। সঙ্গে নিয়ে আসছেন অভিজ্ঞতার অমূল্য ভাণ্ডার, নতুন আত্মবিশ্বাস এবং স্বপ্নের এক নতুন দিশা।

মুকুট জেতা না জিতেই তিনি জিতে নিয়েছেন দেশবাসীর হৃদয়। তার এই যাত্রা প্রমাণ করে দিয়েছে যে সাফল্য শুধু মুকুটে নয়, মানুষের ভালোবাসা এবং নিজের বিকাশেও।

থাইল্যান্ডের ১৯ দিন মিথিলাকে শুধু একজন প্রতিযোগী নয়, একজন সম্পূর্ণ নতুন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে। আর এই নতুন মিথিলা এখন প্রস্তুত নতুন স্বপ্ন পূরণ করতে—বাংলাদেশের সিনেমার পর্দায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *