রাজনাথ সিংয়ের সিন্ধু মন্তব্যে পাকিস্তানের তীব্র প্রতিক্রিয়া

Grunge flags of India and Pakistan divided by barb wire illustration, concept of tense relations between India and Pakistan

‘সম্প্রসারণবাদী মানসিকতা ও আঞ্চলিক শান্তির জন্য হুমকি’—ইসলামাবাদের অভিযোগ

ইসলামাবাদ, ২৪ নভেম্বর: সিন্ধু প্রদেশ নিয়ে ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সাম্প্রতিক মন্তব্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে পাকিস্তান। রোববার জারি করা এক বিবৃতিতে ইসলামাবাদ রাজনাথের বক্তব্যকে দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি এবং ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা বলে সমালোচনা করেছে।

রাজনাথ সিং কী বলেছিলেন?

ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুসারে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, সিন্ধু অঞ্চল ভৌগোলিকভাবে বর্তমানে পাকিস্তানের অধীনে থাকলেও সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত দিক থেকে এটি চিরকালই ভারতীয় পরিচয়ের অংশ।

তিনি আরও যোগ করেন যে সীমারেখা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে এবং ভবিষ্যতে সিন্ধু পুনরায় ভারতের অংশ হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

রাজনাথ সিং এও দাবি করেন যে, তার প্রজন্মের সিন্ধুর হিন্দু জনগোষ্ঠী দেশভাগের সময় এই অঞ্চল পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়াকে মনেপ্রাণে কখনো স্বীকার করেননি।

ইসলামাবাদের কঠোর জবাব

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এক দীর্ঘ বিবৃতি প্রকাশ করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, রাজনাথ সিংয়ের এই ধরনের বক্তব্য সম্প্রসারণবাদী চিন্তাধারার প্রতিফলন, যা আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, এই ধরনের মন্তব্য স্বীকৃত আন্তর্জাতিক সীমানাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করার প্রচেষ্টা।

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, রাজনাথের বক্তব্য হিন্দুত্ববাদী সম্প্রসারণবাদী এজেন্ডাকে তুলে ধরে, যা অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।

ভারতের প্রতি পাল্টা পরামর্শ

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতীয় নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ড নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার পরিবর্তে তাদের উচিত নিজেদের দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যার দিকে মনোযোগ দেওয়া।

বিবৃতিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়:

সংখ্যালঘু সুরক্ষা: ভারতের নিজ দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষত মুসলিম ও অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ধর্মীয় সহিংসতা: সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও ধর্মভিত্তিক সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে।

ঐতিহাসিক বৈষম্য: ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে তৈরি করা বৈষম্যমূলক পরিবেশ দূর করার দায়িত্ব ভারতের।

উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও কাশ্মীর প্রসঙ্গ

পাকিস্তান তার বিবৃতিতে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করেছে। বলা হয়েছে, সেখানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চনা, পরিচয়ভিত্তিক নিপীড়ন এবং রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার হচ্ছে।

কাশ্মীর বিষয়ে নিজেদের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে ইসলামাবাদ বলেছে, ভারতের উচিত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব এবং কাশ্মীরের জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী জম্মু-কাশ্মীর সমস্যার সমাধানে সত্যিকারের পদক্ষেপ নেওয়া।

পাকিস্তানের শান্তির প্রতিশ্রুতি

বিবৃতির শেষে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তিতে বিশ্বাসী।

তবে একই সঙ্গে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, পাকিস্তান তার সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় যেকোনো পদক্ষেপ নিতে সর্বদা প্রস্তুত থাকবে।

আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা

রাজনাথ সিংয়ের এই মন্তব্য ও পাকিস্তানের তীব্র প্রতিক্রিয়া দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।

দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সম্পর্ক ইতিমধ্যেই বেশ উত্তপ্ত থাকায় এই ধরনের বক্তব্য আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখনো এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি, তবে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় সিন্ধু প্রদেশ পাকিস্তানের অংশ হয়। এই অঞ্চল প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার কেন্দ্রস্থল হিসেবে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

দেশভাগের সময় বহু হিন্দু পরিবার সিন্ধু থেকে ভারতে চলে যায়। তবে এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের দাবি আন্তর্জাতিক আইন ও বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *