ই-পারিবারিক আদালতের উদ্বোধনে আইন উপদেষ্টা, বললেন—’রাষ্ট্রকাঠামো দুর্বল করে সংস্কার নয়’
বাংলাদেশে যত পরিবর্তন বা সংস্কার হয়েছে, তার সবই আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে সম্পন্ন হয়েছে—এমন মন্তব্য করেছেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। সোমবার রাজধানীতে ই-পারিবারিক আদালত চালু উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
ঢাকা মহানগর আদালতের জগন্নাথ-সোহেল স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবও উপস্থিত ছিলেন।
পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে নতুন যুগ
অনুষ্ঠানে আসিফ নজরুল জানান, পারিবারিক সমস্যা সমাধানের জন্য এখন থেকে মানুষকে আদালতে ছুটতে হবে না। লিগ্যাল এইড ব্যবস্থার আওতায় বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, এই নতুন পদ্ধতিতে একক বিচারকের পরিবর্তে তিনজন বিচারককে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, যা বিচারিক প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করবে।
বাস্তবসম্মত সংস্কার জরুরি
আইন উপদেষ্টা মনে করেন, সংস্কার পরিকল্পনা করার সময় বাস্তবতার দিকে নজর রাখা অত্যন্ত জরুরি। তিনি স্বীকার করেন, “আমরা যতটা করতে চেয়েছিলাম, ততটা সম্ভব হয়নি। তবে প্রত্যাশা রাখছি যে, আগামী সরকারও এসব পদক্ষেপ চালিয়ে যাবে। অন্যথায় এই প্রচেষ্টাগুলো ধীরে ধীরে মুছে যাবে।”
আসিফ নজরুল সতর্ক করে বলেন, অতিরিক্ত সংস্কারের নামে রাষ্ট্রযন্ত্রকে দুর্বল করার সুযোগ নেই। যেকোনো উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য ধাপে ধাপে এগোতে হয়।
২১টি ক্ষেত্রে সংস্কার সাধিত
আইন মন্ত্রণালয়ের সংস্কার কার্যক্রমের তথ্য তুলে ধরে আসিফ নজরুল বলেন, এ পর্যন্ত ২১টি বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।
তবে তিনি সতর্ক করেন, আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং ধারাবাহিকতা না থাকলে এই সংস্কারগুলো টেকসই হবে না।
“শুধু উদ্যোগ নিলেই হয় না, সেগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে,” যোগ করেন তিনি।
পেপারলেস বিচার ব্যবস্থার দিকে অগ্রগতি
পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ই-পারিবারিক আদালত প্রসঙ্গে বলেন, “এই নতুন উদ্যোগ কাগজবিহীন বিচার ব্যবস্থাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে, যা আমার কাছে অত্যন্ত আনন্দের।”
তিনি এই আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণ করার জন্য আইনজীবী সমাজকে ধন্যবাদ জানান।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব মন্তব্য করেন, এই ডিজিটাল উদ্যোগ আইন পেশার সঙ্গে যুক্তদের আরও দ্রুততার সঙ্গে এবং কার্যকরভাবে সেবা প্রদানে সহায়ক হবে।
সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী জানান, ই-পারিবারিক আদালত বিচারব্যবস্থাকে পেপারলেস পদ্ধতির দিকে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
ই-পারিবারিক আদালতের সুবিধা
নতুন এই ব্যবস্থায়:
- কাগজপত্রের ঝামেলা কমবে
- মামলার খরচ সাশ্রয় হবে
- দ্রুত বিচার সম্ভব হবে
- দূর থেকেও অংশগ্রহণ করা যাবে
- পরিবেশবান্ধব বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে
সংস্কারের ধারাবাহিকতা জরুরি
আসিফ নজরুলের মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, তিনি সংস্কার কার্যক্রমের দীর্ঘমেয়াদী ধারাবাহিকতা নিয়ে চিন্তিত। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ সীমিত হওয়ায় তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে, পরবর্তী নির্বাচিত সরকারও এই উদ্যোগগুলো চালিয়ে যাবে।
আইন ও বিচার ব্যবস্থার সংস্কার একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া এবং তা সফল করতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন—এই বার্তাই দিয়েছেন আইন উপদেষ্টা।
আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ
আসিফ নজরুলের বক্তব্যে যে বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে তা হলো—সংস্কার অবশ্যই আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে করতে হবে। রাষ্ট্রযন্ত্রকে দুর্বল করে বা আইনের বাইরে গিয়ে কোনো পরিবর্তন টেকসই হয় না।
এই দর্শন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার গুরুত্বকে তুলে ধরে। দ্রুত পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও তা অবশ্যই সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হতে হবে।

